কুয়ালালামপুরে প্রবাসী ভারতীয়দের সমাবেশে ভারত–মালয়েশিয়া বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় করার বার্তা প্রধানমন্ত্রীর

কুয়ালালামপুর, ৭ ফেব্রুয়ারি : শনিবার মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে এক কমিউনিটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রবাসী ভারতীয়দের উষ্ণ অভ্যর্থনার প্রশংসা করে তিনি বলেন, এই ভালোবাসা ও আন্তরিকতা দুই দেশের অভিন্ন সংস্কৃতির সুন্দর বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে। তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী ইব্রাহিম নিজে বিমানবন্দরে এসে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন ও নিজের গাড়িতে করে অনুষ্ঠানে নিয়ে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, “এই বিশেষ সৌজন্য ভারতের প্রতি এবং এখানে উপস্থিত মানুষের প্রতি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ভালোবাসা ও সম্মানের প্রতিফলন।”

অনুষ্ঠানে ৮০০-রও বেশি নৃত্যশিল্পীর অংশগ্রহণে আয়োজিত বিশাল সাংস্কৃতিক পরিবেশনার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অনবদ্য পরিবেশনা বহু বছর ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি সকল শিল্পীকে অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব প্রধানমন্ত্রিত্বের আগের এবং তিনি তাঁর সংস্কারমুখী দৃষ্টিভঙ্গি, প্রখর মেধা ও ২০২৫ সালে আসিয়ান-এর সফল সভাপতিত্বের প্রশংসা করেন।

গত বছর আসিয়ান সম্মেলনে যোগ দিতে না পারার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি মালয়েশিয়া সফরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং তা পূরণ করতে পেরে আনন্দিত। ২০২৬ সালে এটি তাঁর প্রথম বিদেশ সফর বলে উল্লেখ করে তিনি উৎসবের মরশুমে প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে থাকতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, সংক্ৰান্তি, পংগল ও থাইপুসাম উৎসব আনন্দের সঙ্গে পালিত হয়েছে বলে তিনি আশা করেন এবং আসন্ন শিবরাত্রি, রমজান ও হারি রায়ার আগাম শুভেচ্ছা জানান।

প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, মালয়েশিয়ায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভারতীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী বসবাস করে এবং ভারত ও মালয়েশিয়ার মানুষের হৃদয়ের মধ্যে গভীর যোগ রয়েছে। প্রদর্শনীতে দেখা সাংস্কৃতিক যোগসূত্রের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতীয় বংশোদ্ভূত সমাজ দুই দেশের মধ্যে এক জীবন্ত সেতু। রুটি চানাই ও মালাবার পরাঠা, নারকেল, মশলা ও তে তারিক এই সব স্বাদ ও ঐতিহ্য কুয়ালালামপুর ও কোচি উভয় জায়গাতেই পরিচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। ভাষাগত মিল, ভারতীয় সিনেমা ও সঙ্গীতের জনপ্রিয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কণ্ঠস্বরের প্রশংসা করে এমজিআরের তামিল গানগুলির প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথাও উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ার ভারতীয় বংশোদ্ভূত সমাজের হৃদয়ে ভারতের বিশেষ স্থান রয়েছে। ২০০১ সালে গুজরাট ভূমিকম্পের সময় প্রবাসীদের সাহায্যের কথা স্মরণ করে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার বহু প্রবাসী ভারতীয়ের পূর্বপুরুষ ভারতের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন এবং অনেকে কখনও ভারতে না এসেও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দিয়েছিলেন। নেতাজির সম্মানে মালয়েশিয়ার ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টারের নামকরণ ও নেতাজি সার্ভিস সেন্টার এবং নেতাজি ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের অবদানের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রবাসী সমাজ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজেদের ঐতিহ্য রক্ষা করে চলেছে বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ায় ৫০০-র বেশি স্কুলে ভারতীয় ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হয়। তিরুবল্লুবর ও স্বামী বিবেকানন্দের প্রভাব, বাতু কেভসে থাইপুসাম উৎসবের ঐশ্বরিক পরিবেশ এবং গর্বার জনপ্রিয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন। শিখ সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভারতের গভীর সাংস্কৃতিক বন্ধনের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, তামিল ভাষা ভারতের বিশ্বকে দেওয়া এক অমূল্য উপহার। তামিল সাহিত্য চিরন্তন, তামিল সংস্কৃতি বিশ্বজনীন এবং তামিল জনগণ মানবতার সেবায় অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি জানান, ভারতের উপরাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণন, বিদেশমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর, অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এবং তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ড. মুরুগন সকলেই তামিলনাড়ুর সন্তান।

ভারত–মালয়েশিয়া সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান দৃঢ়তার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের দিল্লি সফরের পর দুই দেশের সম্পর্ক সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত হয়েছে। তিনি বলেন, দুই দেশ একে অপরের সাফল্যকে নিজেদের সাফল্য হিসেবে উদযাপন করছে।

চন্দ্রযান-৩-এর সাফল্যে মালয়েশিয়ার শুভেচ্ছার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতের সাফল্য মানেই মালয়েশিয়া ও এশিয়ার সাফল্য। তিনি ভারত–মালয়েশিয়া অংশীদারিত্বকে ‘IMPACT’—সম্মিলিত রূপান্তরের অগ্রগতির জন্য ভারত-মালয়েশিয়া অংশীদারিত্ব হিসেবে অভিহিত করেন।

ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশটি দ্রুত উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে এবং বিশ্বে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রবাসী ভারতীয়দের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে তিনি জানান, মালয়েশিয়ার ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকদের ষষ্ঠ প্রজন্ম পর্যন্ত ওসিআই কার্ডের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি থিরুবল্লুবর স্কলারশিপ, নলেজ ইন্ডিয়া প্রোগ্রাম এবং মালয়েশিয়ায় নতুন ভারতীয় কনস্যুলেট খোলার ঘোষণাও করেন তিনি।

ভাষণের শেষে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত গড়ার লক্ষ্যে ১৪০ কোটি ভারতীয় একসঙ্গে এগিয়ে চলেছে এবং প্রবাসী ভারতীয় সমাজ এই যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কুয়ালালামপুরে জন্ম হোক বা কলকাতায়—ভারত প্রবাসীদের হৃদয়ে বাস করে, এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।

Leave a Reply