ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনে ছয় গুণ প্রবৃদ্ধি: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক

নয়াদিল্লি, ১৩ অক্টোবর : ভারতের ইলেকট্রনিক্স খাত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এক ঐতিহাসিক মাইলফলকে পৌঁছেছে, যেখানে উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ১১.৩ লাখ কোটিতে — যা ২০১৪-১৫ সালের ১.৯ লাখ কোটি থেকে ছয় গুণ বৃদ্ধি। গত এক দশকে এই খাতের রূপান্তর ঘটেছে উল্লেখযোগ্যভাবে, যার পেছনে রয়েছে ঘরোয়া নীতিগত সহায়তা, উৎপাদন ক্ষমতার দ্রুত সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলার সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সংযুক্তি। এই অভিযাত্রায় তৈরি হয়েছে ২৫ লাখেরও বেশি কর্মসংস্থান, যা ইলেকট্রনিক্সকে ভারতের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল ও কর্মসংস্থানমুখী খাতে পরিণত করেছে।

এই অগ্রগতি ভারতের বৃহত্তর লক্ষ্য — ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ — এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ৫০০ বিলিয়ন মূল্যের ঘরোয়া ইলেকট্রনিক্স ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে, ভারত এখন বৈশ্বিক ইলেকট্রনিক্স ডিজাইন, উৎপাদন ও রপ্তানির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার পথে অগ্রসর। গত এক দশকে খাতটি কাঠামোগত রূপান্তর দেখেছে, যার পেছনে রয়েছে সহায়ক নীতিমালা, ব্যবসা সহজীকরণের পরিবেশ এবং বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আস্থা। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে উৎপাদনে ছয় গুণ বৃদ্ধির পাশাপাশি রপ্তানি ৩৮,০০০ কোটি থেকে বেড়ে ৩.২৭ লাখ কোটিতে পৌঁছেছে — যা আট গুণ বৃদ্ধি।

বিশ্বব্যাপী ইলেকট্রনিক্স সরবরাহ শৃঙ্খলায় ভারতের ভূমিকাও ক্রমেই কৌশলগত গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ভারতে ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ এসেছে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যার প্রায় ৭০ শতাংশ এসেছে উৎপাদন সংক্রান্ত প্রধান প্রকল্প, অর্থাৎ প্রোডাকশন লিংকড ইনসেনটিভ স্কিমের আওতাধীন সংস্থাগুলোর কাছ থেকে। বর্তমানে ভারতীয় ইলেকট্রনিক্স পণ্য রপ্তানি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য এবং ইতালির মতো প্রধান বাজারে।

এই সাফল্যের কেন্দ্রে রয়েছে মোবাইল ফোন শিল্প। ২০১৪-১৫ সালে যেখানে মোবাইল উৎপাদন ছিল মাত্র ১৮,০০০ কোটি, তা ২০২৪-২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ₹৫.৪৫ লাখ কোটিতে — অর্থাৎ ২৮ গুণ বৃদ্ধি। প্রতি বছর প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন মোবাইল ফোন উৎপাদনের মাধ্যমে ভারত এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল নির্মাতা দেশ। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০১৪-১৫ সালে মোবাইল ফোনের ৭৮ শতাংশ আমদানি করতে হলেও বর্তমানে দেশ প্রায় স্বনির্ভর।

রপ্তানির ক্ষেত্রেও মোবাইল ফোন শিল্প নজিরবিহীন বৃদ্ধি দেখেছে। ২০১৪-১৫ সালে যেখানে রপ্তানি ছিল ১,৫০০ কোটি, তা ২০২৪-২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ কোটিতে — এক দশকে ১২৭ গুণ বৃদ্ধি। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বৈশ্বিক নির্মাতাদের ভারতের উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহারে আগ্রহ। শুধুমাত্র অ্যাপল একাই ২০২৪ সালে ১,১০,৯৮৯ কোটি মূল্যের আইফোন ভারতে উৎপাদন করে রপ্তানি করেছে, যা বছরে ৪২ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুটিও ছিল জোরদার। প্রথম পাঁচ মাসেই স্মার্টফোন রপ্তানি ১ লাখ কোটি ছাড়িয়ে গেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৫ শতাংশ বেশি। দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ভারত যুক্তরাষ্ট্রে স্মার্টফোন রপ্তানিতে চীনকে অতিক্রম করেছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় এক নতুন মোড় নির্দেশ করে। ২০১৪ সালে মাত্র দুটি মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী ইউনিট থাকলেও বর্তমানে ভারতে ৩০০টিরও বেশি কারখানা রয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং বৈশ্বিক রপ্তানি দুইই মেটাচ্ছে।

মোবাইল ফোন ছাড়াও, ইলেকট্রনিক্স এখন দেশের প্রায় সব খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ঘর, হাসপাতাল, কারখানা বা যানবাহনে — সর্বত্রই ইলেকট্রনিক্স উদ্ভাবন, দক্ষতা ও জীবনমান বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। ভোক্তা ইলেকট্রনিক্সে (টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, এসি) সহজলভ্যতা ও বাড়ন্ত চাহিদা অভ্যন্তরীণ বাজারের বিস্তারকে নির্দেশ করে। ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট উৎপাদনের মাধ্যমে ভারত এখন আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দিকে এগোচ্ছে।

অটোমোটিভ ইলেকট্রনিক্স খাতে, বৈদ্যুতিক ও সংযুক্ত যানবাহনের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সেন্সর, ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম, ও কন্ট্রোল ইউনিটের মতো যন্ত্রাংশের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিকিৎসা ইলেকট্রনিক্সেও যেমন অক্সিমিটার, গ্লুকোমিটার ও মনিটরিং ডিভাইস ব্যবহারের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে, যা স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান বৃদ্ধি ও প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করছে।

এই খাতের উন্নয়নে সরকার পরিচালিত একাধিক নীতিমালা ও স্কিম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। প্রোডাকশন লিংকড ইনসেনটিভ স্কিম, ১.৯৭ লাখ কোটি বরাদ্দ সহ ১৪টি খাতের জন্য চালু হয়েছে। জুন ২০২৫ পর্যন্ত এই স্কিমের মাধ্যমে ১৩,১০৭ কোটি বিনিয়োগ এসেছে, উৎপাদন হয়েছে ৮.৫৬ লাখ কোটি, রপ্তানি পৌঁছেছে ৪.৬৫ লাখ কোটিতে এবং সৃষ্টি হয়েছে ১.৩৫ লাখ সরাসরি কর্মসংস্থান।

ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে পুঁজিবিনিয়োগে ২৫ শতাংশ ভর্তুকি দেয়ার স্কিম স্পেকস, এবং মে ২০২৫-এ অনুমোদিত ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং স্কিম এই খাতকে আরও সুসংহত করছে। ইসিএমএস-এর আওতায় ২২,৯১৯ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দে প্রথম পর্যায়েই ২৪৯টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মাধ্যমে ১.১৫ লাখ কোটি বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে — যা মূল লক্ষ্য থেকে দ্বিগুণ বেশি। প্রক্ষেপিত উৎপাদন ৬ বছরে ১০.৩৪ লাখ কোটি, এবং ১.৪২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এছাড়াও, ন্যাশনাল পলিসি অন ইলেকট্রনিক্স ২০১৯ ভারতকে ইলেকট্রনিক্স সিস্টেম ডিজাইন অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং-এ বিশ্ব নেতৃত্বে নিয়ে যাওয়ার কৌশলগত রূপরেখা তৈরি করেছে। এই নীতির লক্ষ্য ২০২৫ সালের মধ্যে ৪০০ বিলিয়নের ইএসডিএম আয় অর্জন, গবেষণা ও ডিজাইনভিত্তিক প্রবৃদ্ধির উপর জোর দিয়ে।

আজকের দিনে ভারতের ইলেকট্রনিক্স খাত শুধু উৎপাদন নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি স্তম্ভ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কর্মসংস্থান, রপ্তানি, আত্মনির্ভরতা এবং বৈশ্বিক মানচিত্রে ভারতের অবস্থান পরিবর্তনের যে প্রতিফলন এই খাতে দেখা যাচ্ছে, তা আগামী দিনের শিল্প, ডিজিটাল ক্ষমতায়ন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের অগ্রগতির দিকনির্দেশ করছে।

২০২৫-৩১ সময়সীমায় ৫০০ বিলিয়ন ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনের লক্ষ্যে এই খাতের বিকাশ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং ভারতের শিল্পকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং আত্মনির্ভরতার শক্ত ভিত রচনা করছে।