কলকাতা, ২২ আগস্ট : সংবিধান সংশোধনী (১৩০তম) বিল নিয়ে বিরোধীদের প্রবল বিরোধিতার মুখে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুক্রবার কলকাতার এক জনসভা থেকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানালেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী ইন্ডিয়া ব্লক বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেস দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের রক্ষা করতেই এই বিলের বিরোধিতা করছে। প্রধানমন্ত্রীর সাফ কথা, আমরা এমন একটি আইন আনছি, যার ফলে কোনো প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রী যদি ৩০ দিনের বেশি সময় ধরে জেলে থাকেন, তবে তিনি আর নিজের পদে থাকতে পারবেন না। কিন্তু এই বিল আনতেই বিরোধীদের রোষ গিয়ে পড়েছে আমাদের উপর।
প্রধানমন্ত্রী মোদি স্পষ্টভাবে জানান, দেশে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালানো হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার সরকারের নজর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের জবাবদিহির দিকে। তিনি বলেন, একজন সরকারি কর্মচারী যদি দুর্নীতির অভিযোগে ধরা পড়েন এবং ৫০ ঘণ্টার মধ্যে জামিন না পান, তাহলে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু এক জন মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রীর ক্ষেত্রে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। আমরা সেই ফাঁক বন্ধ করতে চেয়েছি।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে ইঙ্গিত করে মোদি বলেন, এটা দেশের লজ্জা যে, একজন মুখ্যমন্ত্রী জেলে গিয়ে সেখান থেকেই সরকার চালাচ্ছেন। এটা চলতে পারে না। যারা দুর্নীতির অভিযোগে ধরা পড়েছে, তারা সরকারের অংশ থাকতে পারে না। মোদি এটা হতে দেবে না।
রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে নিশানা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, টিএমসির দুই প্রাক্তন মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও জ্যোতি প্রিয় মল্লিক, দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পরও পদ ছাড়তে চাননি। এটা স্পষ্ট দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া। তাই আমরা কঠোর আইন আনছি, আর সেই কারণেই বিরোধীরা আতঙ্কিত। ওরা রেগে গেছে, কারণ নিজেদের গলদ ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দেশে আজ এমন পরিস্থিতি হয়েছে, যেখানে কিছু নেতা এত নিচে নেমে গেছেন, তাঁরা জেল থেকে সরকার চালাতে চাইছেন। এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। আমরা এমন কিছু করতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই ধরনের আইনগত ফাঁকির সুযোগ না নিতে পারে।
এই বিল নিয়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ স্পষ্ট। বিরোধীরা যাকে গণতন্ত্র বিরোধী ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আইন বলছে, প্রধানমন্ত্রী মোদি তাকে ব্যাখ্যা করছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে। রাজনৈতিক স্বার্থ ও নৈতিক দায়বদ্ধতার সংঘাতে এবার সংসদে ও রাস্তায় বড় লড়াই দেখা দিতে চলেছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এদিকে, কলকাতায় সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী প্রায় ৫,২০০ কোটি টাকার একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করেন। এর মধ্যে ছিল ৬ লেন বিশিষ্ট এলিভেটেড কোণা এক্সপ্রেসওয়ের শিলান্যাস ও তিনটি মেট্রো রুটের উদ্বোধন। নোয়াপাড়া থেকে জয় হিন্দ বিমানবন্দর পর্যন্ত মেট্রো সফরের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে মোদি বলেন, কলকাতার পাবলিক ট্রান্সপোর্টের আধুনিকীকরণ দেখে সবাই খুশি। কলকাতা শহর ভারতের ইতিহাস ও ভবিষ্যতের প্রতীক। তিনি জানান, কলকাতা মেট্রোর নেটওয়ার্কে প্রায় ১৪ কিমি নতুন রেললাইন যুক্ত হয়েছে এবং ৭টি নতুন স্টেশনও তৈরি হয়েছে। এই উন্নয়ন ‘জীবনযাত্রার সহজতা’ ও ‘ভ্রমণের সহজতা’ বাড়াবে বলেও দাবি করেন মোদি।
মোদির কথায়, আজ ভারতের প্রতিটি শহরে আধুনিক রেল, রোড, মেট্রো এবং এয়ারপোর্টের মধ্যে সংযুক্তির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কলকাতা শহর এই পরিবর্তনের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। তাঁর বক্তব্য, হাওড়া ও শিয়ালদহ দেশের ব্যস্ততম দুই স্টেশন, এখন মেট্রোর মাধ্যমে সংযুক্ত হয়েছে। হাওড়া সাবওয়ের ফলে যাত্রীদের জন্য মাল্টিমোডাল কানেক্টিভিটি আরও সহজ হয়েছে। কলকাতা বিমানবন্দরও মেট্রো রুটে যুক্ত হয়েছে, যা শহরের নানা প্রান্ত থেকে যাতায়াত সহজ করবে।
পশ্চিমবঙ্গ ১০০% রেল ইলেকট্রিফিকেশনের রাজ্যগুলোর মধ্যে পড়েছে বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুরুলিয়া থেকে হাওড়া পর্যন্ত মেমু ট্রেন চালুর বহুদিনের দাবি আমরা পূরণ করেছি। রাজ্যে এখন ৯টি বন্দে ভারত ট্রেন এবং ২টি অমৃত ভারত ট্রেন চলছে। তিনি জানান, কোণা এক্সপ্রেসওয়ে সম্পূর্ণ হলে বন্দর সংযোগ আরও মজবুত হবে এবং এই উন্নয়ন পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যতের ভিতকে দৃঢ় করবে।
এদিন এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যপাল ডঃ সি. ভি. আনন্দ বোস, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর, রবনীত সিং বিট্টু, এবং রাজ্য বিজেপি সভাপতি ডঃ সুকান্ত মজুমদার প্রমুখ।

