জেলে থাকা মুখ্যমন্ত্রীদের অপসারণ নিয়ে বিল সংসদে, বিরোধীদের তীব্র প্রতিক্রিয়া

নয়াদিল্লি, ২১ আগস্ট: কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গতকাল সংসদে উপস্থাপন করলেন একটি বিতর্কিত বিল – সংবিধান (১৩০তম সংশোধনী) বিল, ২০২৫ – যার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী এবং অন্যান্য মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে যদি এমন অপরাধে মামলা হয় যার সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছরের বেশি, এবং তারা ৩০ দিনের বেশি কারাবন্দি থাকেন, তবে তারা পদচ্যুত হবেন। এই বিলকে কেন্দ্র করে লোকসভায় তীব্র হইচই হয়, বিরোধী দলগুলি বিলটিকে “অগণতান্ত্রিক”, “স্বৈরাচারী” ও “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে অভিযোগ করে। তাঁদের দাবি, এই বিলের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধী মুখ্যমন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করে মিথ্যা মামলা রুজু করবে এবং রাজ্য সরকারগুলি ফেলে দেওয়ার চেষ্টা চালাবে। এই প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, অভিযুক্ত নেতাকে পদচ্যুত করতে আদালতের সাজা প্রয়োজন হবে না; শুধু অভিযোগ এবং ৩০ দিনের জেলই যথেষ্ট হবে। তবে মুক্তি পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পুনরায় সেই পদে নিয়োগ পেতে পারবেন।

সরকারের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই আইনের উদ্দেশ্য হল রাজনীতির নৈতিক মানদণ্ড উন্নত করা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। বিলের ‘স্টেটমেন্ট অফ অবজেক্ট এন্ড রিসন্স ‘-এ বলা হয়েছে, নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে একজন মন্ত্রীর চরিত্র ও আচরণ এমন হওয়া উচিত যা কোনও সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকে। কিন্তু বিরোধীরা এই যুক্তি মানতে নারাজ। কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বিলটিকে “একটি ঢাকনার আড়ালে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চক্রান্ত” বলে উল্লেখ করেন, এবং বলেন যে এটিকে দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে প্রচার করা জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই বিলের বিরোধিতা করে বলেন, এটি সরকারের হাতে ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থের একচেটিয়া অধিকার বজায় রাখার চেষ্টা। এআইএমআইএম নেতা আসাদউদ্দিন ওয়াইসি বলেন, এই বিল দেশকে একটি “পুলিশ রাষ্ট্র”-এর দিকে নিয়ে যাবে এবং নির্বাচিত সরকারের উপর শেষ পেরেক হবে।

বিলটি এমন এক সময় পেশ করা হয়েছে যখন সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শেষের মুখে। সরকারি সূত্র বলছে, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হবে এবং বিলটি এখন ২১ জন লোকসভার ও ১০ জন রাজ্যসভার সাংসদদের নিয়ে গঠিত যৌথ সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হবে। সংসদে এই ধরনের বিতর্কিত বিল সাধারণত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হলেও, তালিকাভুক্তির সময়ই এটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা বিরল ঘটনা। এক্ষেত্রে সরকার নিজেই জানে যে সংসদে তাদের কাছে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যা নেই – যা একটি সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করাতে বাধ্যতামূলক। লোকসভায় ৩৬১ ভোট ও রাজ্যসভায় ১৬০ ভোট প্রয়োজন, যেখানে এনডিএ জোটের যথাক্রমে ২৯৩ ও ১৩২ ভোট রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধীদের ছাড়া বিলটি পাস করানো সম্ভব নয়।

তবু বিলটি কেন পেশ করা হল? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি ধারণার লড়াই । সরকার এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় যেখানে বিরোধীদের এই বিলের বিরোধিতা জনসাধারণের চোখে “দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতির পক্ষে অবস্থান” বলে প্রতিভাত হয়। সরকার বলছে, বিলটির পেছনে উদ্দেশ্য শুধুই রাজনৈতিক স্বচ্ছতা রক্ষা করা, এবং অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো মুখ্যমন্ত্রীরা জেলে থেকেও পদে থাকার যে নজির স্থাপন করেছেন, সেটিকে সাংবিধানিকভাবে প্রতিরোধ করার জন্যই এই আইন প্রয়োজন। যদিও বিলটি সরাসরি কেজরিওয়ালের নাম উল্লেখ করেনি, সরকারি সূত্র জানিয়েছে, এই ধরনের পরিস্থিতি থেকেই আইনি অস্পষ্টতা দূর করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

সরকার বলছে, তারা এই বিলটি তখনই আনেনি যখন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী জেলে গিয়েছিলেন, কারণ সেটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে দেখাত। বর্তমানে দিল্লিতে এএপি-এর শাসন শেষ, তাই এখন এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারের মতে, এই বিল আইনে পরিণত হোক বা না হোক, বিরোধীরা যদি এর বিরুদ্ধে যায়, তাহলে তারা জনগণের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। লোকসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, “আমি নিজে ২০১০ সালে গ্রেফতার হওয়ার আগে পদত্যাগ করেছিলাম। আমরা এতটা নির্লজ্জ হতে পারি না যে অভিযোগের মুখেও পদ আঁকড়ে থাকি।”

তবে আইনের পথ মসৃণ নয়। বিলটি সাংবিধানিক কাঠামোর উপর প্রভাব ফেলার কারণে, অর্ধেক রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অনুমোদনও প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি, এটি “দোষী না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ” নীতির পরিপন্থী হওয়ায় আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। এই বিতর্কিত বিল নিয়ে সংসদ, রাজনীতি ও বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘ টানাপড়েন চলবে বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে একথা স্পষ্ট, ২০২৫ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করতে চলেছে — যেখানে আইন, নৈতিকতা ও রাজনীতির বাস্তবতা পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।