সামাজিক মাধ্যমে হিন্দুদের নিয়ে মন্ত্রী সুধাংশু দাসের বক্তব্য ঘিরে বিধানসভা অধিবেশনে তুমুল হৈ হট্টগোল, ওয়েলে নেমে বিরোধীদের বিক্ষোভ

আগরতলা, ৪ সেপ্টেম্বর : সামাজিক মাধ্যমে হিন্দুদের নিয়ে মন্ত্রী সুধাংশু দাসের বক্তব্যকে ঘিরে আজ বিধানসভা অধিবেশনে তুমুল হৈ হট্টগোল হয়েছে। বিরোধীরা মন্ত্রী সহ ট্রেজারি বেঞ্চকে চেপে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। সুধাংশু দাসের ওই বক্তব্যকে বিজেপি এমনকি রাজ্য সরকার সমর্থন করে না, অধিবেশনে পরিবহণ মন্ত্রী বুঝিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু, ব্যক্তিগত মত প্রকাশের অধিকার দেশের সংবিধান সকলকে দিয়েছে, বিরোধীদের তিনি সেটাও মনে করিয়েছেন। সুধাংশু দাসের সমর্থনে এদিন কৃষি মন্ত্রী রতন লাল নাথ সামাজিক মাধ্যমে হিন্দুদের নিয়ে ওই বক্তব্যে ব্যবহৃত শব্দের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সাথে তিনি দাবি করেছেন, রাজ্যে দাঙ্গা লাগুক সিপিএম তা চেয়েছে। পরিশেষে আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সুধাংশু দাস কংগ্রেস এবং সিপিএমকে হিন্দু বিরোধী বলে নিশানা করেছেন। প্রতিবাদে বিরোধীরা ওয়েলে নেমে কিছুক্ষণ বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। 

আজ বিধানসভা অধিবেশনে শূন্যকালে কংগ্রেস বিধায়ক বীরজিৎ সিনহা সামাজিক মাধ্যমে মন্ত্রী সুধাংশু দাসের হিন্দুদের নিয়ে বক্তব্যের বিষয় উত্থাপন করেন। তাঁর কথায়, সামাজিক মাধ্যমে এধরণের বক্তব্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক। তাতে, রাজ্যের মানুষ বিচলিত হয়ে পড়েছেন। এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে বক্তব্যের জন্য মন্ত্রী সুধাংশু দাসের ক্ষমা চাওয়া উচিত। তাতেই, ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্যরা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেন এবং সুধাংশু দাসের সমর্থনে আওয়াজ তুলেন। বিজেপি বিধায়ক অভিষেক রায়ের মতে, বাংলাদেশের পরিস্থিতির নিরিখে আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী হয়ে উঠেছে। জিহাদী বাহিনী এরাজ্যে তাঁদের গতিবিধি বৃদ্ধি করুক, তা মোটেও কাম্য নয়। তাঁর দাবি, বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব ইতিমধ্যেই আমাদের রাজ্যেও পড়েছে। সেজন্যই মন্ত্রী সুধাংশু দাস সকলকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে সামাজিক মাধ্যমে বার্তা দিয়েছিলেন। 

বিজেপি বিধায়ক অভিষেক রায়ের সাফাইয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন কংগ্রেস বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মণ। তাঁর মতে, ভারত সংবিধান দ্বারা পরিচালিত। ফলে, সংবিধানের শপথ নেওয়া ব্যক্তি এমন উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখতে পারেন না। তিনি বিদ্রুপের সুরে বলেন, পরবর্তীতে বিতর্কিত ওই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যম থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। কিন্তু, রাজ্যের শান্তি শৃংখলা বিঘ্নিত হবে এমন কোন কাজ মন্ত্রী পদে থেকে করা উচিত নয়। সুধাংশুকে উদ্দেশ্য করে সুদীপের কটাক্ষ, আপনার বক্তব্যে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আঘাত হোক, তা কাম্য নয়। তাই, আপনার ক্ষমা চাওয়া উচিত। 

তাতে পরিবহণ মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী উঠে দাঁড়ান এবং সুধাংশু দাসের সমর্থনে সাফাই দিয়েছেন। তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যমে ওই বক্তব্য আমরা সকলেই দেখেছি। পরবর্তীতে ওই বক্তব্য মুছে ফেলা হয়েছে। কারণ, বিজেপি এবং রাজ্য সরকার মন্ত্রী সুধাংশু দাসের বক্তব্যকে সমর্থন করে না। কিন্তু, ব্যক্তিগত মত প্রকাশের অধিকার আমাদের সংবিধান সকলকেই দিয়েছে। একইভাবে মন্ত্রী সুধাংশু দাসের সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন বিধায়ক বিনয় ভূষণ দাস। কিন্তু, এরই মাঝে বিরোধী দলনেতা প্রশ্ন তুলেন, ঘৃণা ভাষণ রেখে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অথচ, সাধারণ নাগরিক এমন কাজ করলে তার বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেওয়া হতো। তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যমে ওই বিতর্কিত বক্তব্য দেখে সঙ্গে সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী এবং জেলা পুলিশ সুপার ও রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশককে অবগত করেছি। তাতে, অবশ্য আখেরে কোন লাভই হয়নি। জিতেন্দ্রও এদিন মন্ত্রী সুধাংশু দাসের ক্ষমা চাওয়া উচিত বলে সোচ্চার হয়েছেন। 

বিরোধীদের একের পর এক চাপে ট্রেজারি বেঞ্চ বেকায়দায় পরে যাচ্ছিল। তখনই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন কৃষি মন্ত্রী রতন লাল নাথ। সামাজিক মাধ্যমে মন্ত্রী সুধাংশু দাসের বিতর্কিত বক্তব্যের প্রতিবাদে সিপিএম রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বিবৃতি তুলে ধরে রতন নাথ দাবি করেন, সিপিএম চেয়েছে রাজ্যে দাঙ্গা লাগুক। কারণ, ওই বক্তব্যে কোথাও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিশানা করা হয়েছে, সে বিষয়ে একটি শব্দও খরচ করা হয়নি। কিন্তু, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে বক্তব্য রেখেছেন মন্ত্রী সুধাংশু চৌধুরী সিপিএম এমনই বিবৃতি দিয়েছে। 

রতন লাল নাথের সাফ কথা, জিহাদী শব্দের অর্থ ইন্টারনেট ঘাটলেই বেরিয়ে আসবে। সুধাংশু দশে বক্তব্যে জিহাদী শব্দের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট কোন সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়নি। ফলে, সিপিএম শব্দের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জনমনে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করেছে। তখনই কংগ্রেস বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মণ জানতে চেয়েছেন, শরীরের রক্ত গরম সম্পর্কে ওই বিতর্কিত বক্তব্যে মন্ত্রী সুধাংশু দাস কি বুঝাতে চেয়েছেন। তাঁর আরও প্রশ্ন, ওই বক্তব্যের মাধ্যমে কি ধর্ম নিরপেক্ষতা মুছতে চাইছেন। সুদীপের এদিন সুধাংশুকে পরামর্শ দেন, সংবিধানের শপথ নিয়ে মন্ত্রীর চেয়ারে বসে ওই ধরণের বিতর্কিত বক্তব্য রাখবেন না। 

এদিকে, বিজেপি বিধায়ক কিশোর বর্মণ, তফাজ্জল হুসেন একের পর এক সকলেই বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য মন্ত্রী সুধাংশু দাসের সমর্থনে উঠে দাঁড়িয়েছেন। কিশোর বর্মনের কথায়, ওই বক্তব্যের মাধ্যমে স্বজাতিকে জাগ্রত করার চেষ্টা হয়েছে। তবে, হিন্দু রক্ষার্থে বক্তব্যে কমিউনিস্টদের বরাবরই গাত্রদাহ হয়। কারণ, তাঁরা হিন্দু বিরোধী। তফাজ্জল হুসেনের দাবি, মুসলিমরা মন্ত্রী সুধাংশু দাসের বক্তব্যের প্রতিবাদ করেননি। 

পরিশেষে আত্মপক্ষ সমর্থনে উঠে দাঁড়ান মন্ত্রী সুধাংশু দাস। তিনি গীতার শ্লোক এবং মহাত্মা গান্ধীর উদ্বৃতি দিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য রাখেন। তাঁর কথায়, ১৯৪৬ সালে নোয়াখালীতে হিন্দু গণহত্যা হয়েছে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের কারণে লক্ষ লক্ষ হিন্দু প্রতিবেশী দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। জম্মু এবং কাশ্মীর হিন্দু মুক্ত করা হয়েছে। সেই সব অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও বর্তমান সময়ে একই প্রবণতা নজরে আসছে। তিনি সুর চড়িয়ে বলেন, কংগ্রেস ও সিপিএম হিন্দু বিরোধী। তাঁরা সন্ত্রাসবাদীদের মদতদাতা। তাতেই বিরোধীরা চটে লাল হয়ে যান এবং হৈচৈ শুরু করে দেন। অধ্যক্ষ হই হট্টগোলের মধ্যেই মন্ত্রী সুধাংশু দাসকে বক্তব্য রাখার জন্য বলেন এবং তাতে বিরোধীরা ওয়েলে নেমে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। বিরোধীদের বিক্ষোভে অল্প কিছু সময়ের জন্য বিধানসভা অধিবেশন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।