আগরতলা, ২৪ আগস্ট : রাজ্যের ভয়ংকর বন্যা পরিস্থিতিতে অবধারিতভাবেই বিপর্যয় নেমে আসে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায়। কাতারে কাতারে ট্রান্সফরমার চলে যায় জলের তলায়। বিদ্যুতের লাইন ছিড়ে যায়। খুটি কোথাও পড়ে যায়, কোথাওবা ভেঙ্গে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দক্ষিণ জেলা এবং গোমতী জেলার বিভিন্ন এলাকা।
কিন্তু ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেডের সমস্ত আধিকারিক, প্রকৌশলী এবং কর্মীরা এই ঘন বর্ষা এবং বিশাল বন্যা পরিস্থিতিতেও বিদ্যুৎ পরিষেবা কে অক্ষুন্ন রাখতে রাত দিন নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যান। কোথাও গলা জলে নেমে, কোথাওবা নৌকো করে, কোথাও সাঁতরে গিয়ে মেরামতি কাজ করে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বেশিরভাগ জায়গাতেই স্বাভাবিক করে ফেলেন। দক্ষিণ জেলার বিভিন্ন শরণার্থী শিবির গুলোতে যাতে বিদ্যুৎ অব্যাহত রাখা যায় সেই চেষ্টা চালানো হয়।
তারপরেও নিরাপত্তাজনিত কারণে বহু এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা বন্ধ রাখতে হয় প্রশাসনিক নির্দেশে। রাত দিন এক করে টানা দুই দিন প্রচেষ্টার পর ঋষ্যমুখ, হরিপুর বাজার, নলুয়া বাজার সহ সংলগ্ন কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়। বহু চেষ্টার পরেও জল দাঁড়িয়ে যাওয়ায় এবং জল না কমায় গাবুর ছড়া , বাহাদুর পাড়া, জয় হরি পাড়া এবং রতনপুরে বিদ্যুতের কর্মী দল পৌঁছাতে পারেনি। তবে ঋষ্যমুখ, মনিরামপুর, কাঠালিয়াবাড়ী, গোড়াবাড়ি, কৈলাস নগর, লেংটা বাড়ি এবং হপ্তা বাড়ি এলাকায় আংশিকভাবে বিদ্যুৎ পুনস্থাপন সম্ভব হয়। এই বিপর্যয়েও শান্তিরবাজারস্থিত জেলা হাসপাতালে নিরন্তরভাবেই বিদ্যুৎ পরিষেবা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়।
শান্তির বাজারের গারদাং এলাকা, যেখানে ভূমিধসে একজন মারা গেছে সেই এলাকা, দেবীপুর, কালাগাং রিয়াং পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকা, অশ্বিনী ত্রিপুরা পাড়া, (যেখানে ভূমিধসে সাতজন মারা যান) দুর্গম এলাকা হলেও বিদ্যুৎ কর্মীরা টানা লড়াই চালিয়ে, এই এলাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সমর্থ হন। এছাড়াও বাইখোড়া বাজার এলাকাতেও বিদ্যুৎ স্বাভাবিক রাখা হয় । তবে বগাফা থেকে জোলাইবাড়ি পর্যন্ত ৩৩ কেভি লাইন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুহুরি নদীতে জল বেড়ে যাওয়ার কারণে বিদ্যুতের খুটি ভেঙ্গে নদীগর্ভে চলে যায়। ৩৩/১১ সাব স্টেশন চলে যায় জলের তলায়। বর্তমানে ৩৩ কেভি লাইন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তা সম্ভব হলে সংলগ্ন এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে। একই কারণে মুহুরিপুর এবং কোয়াইফাং এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা এখনো স্বাভাবিক করা যায়নি । এই এলাকায় নয়টি ট্রান্সফরমার এখনো জলের তলায় রয়েছে। বিদ্যুৎ কর্মীরা রাতদিন কাজ করে বিশাল জলরাশির মাঝেও বেতাগা, পালপাড়া, বাইখোড়া বাজার , পূর্ব চরকবাই, আনন্দ বৈদ্য পাড়া, স্বপন বিশ্বাস পাড়া , এসএসবি ক্যাম্প এলাকা, কমলা বুথ এলাকা ,লাউগান, শান্তিরবাজার , মহামনি, কলাছড়া, শান্তি কলোনি, বীরেন্দ্র ত্রিপুরা পাড়া সহ আরো বেশ কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা স্বাভাবিক করেছেন।
ভয়ংকরতম এই বন্যায় গোমতি জেলার পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ। অমরপুর এবং করবুক মহকুমায় বিদ্যুৎ পরিষেবা শুরু করার মত পরিস্থিতি এখনো এসে পৌঁছায়নি । বেশিরভাগ জায়গাতেই ট্রান্সফর্মার জলের তলায় রয়েছে। এমনকি পরিবাহী তারও বহু জায়গায় হেলে গিয়ে জলের তলায় চলে গিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ নিগমের প্রকৌশলী এবং কর্মীরা দিনরাত চেষ্টা করেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারছেন না। কারণ মালবাসা, রাঙ্গামাটি, ছবিমুড়া , নতুন বাজার, ডালাক, যতন বাড়ি , সর্বং সহ বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো জলের তলায় রয়েছে ।একইভাবে উদয়পুর শহরের কিছু এলাকা সহ কাকরাবনে ৩৩ কেভি লাইন জলের তলায় থাকায় সেখানেও বিদ্যুৎ পরিষেবা স্বাভাবিক করা যাচ্ছে না । এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হলে হাজার হাজার মানুষের বিপদের কারণ হতে পারে। এদিকে জল সরে না যাওয়া পর্যন্ত কোনোভাবেই মেরামতিকার্য করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি গোমতী জেলার বিভিন্ন স্থানে ধানের ক্ষেতে কিংবা জলাভূমিতে বিদ্যুতের লাইন পড়ে গিয়েছে । এক্ষেত্রে বিদ্যুতের লাইনের কাছাকাছি মাছ ধরা বিপদজনক হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিদ্যুৎ নিগমের তরফে সর্বসাধারণকে সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ নিগমের আবেদন, কোনোভাবেই বৈদ্যুতিক খুঁটি কিংবা বৈদ্যুতিক লাইনের কাছাকাছি যেন কোনভাবেই কেউ না যান। কারণ জলের সঙ্গে থাকা কিংবা জলের তলায় পড়ে থাকা বিদ্যুতের তার বিপদের কারণ হতে পারে। এই পরিস্থিতিতেও গোমতী জেলার বিভিন্ন এলাকায় গলা জলে নেমেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছেন বিদ্যুৎ কর্মীরা। কাজ করতে গিয়ে বোট পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না । এতে কাজের দ্রুততার ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তারপরেও বিদ্যুৎ নিগমের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও পরিষেবা স্বাভাবিক করতে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।

