কলকাতা, ১৩ আগস্ট(হি.স) : আগস্ট মাস জুড়ে সারাদেশে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। এই পরিস্থিতিতে অজ্ঞাতনামা বিপ্লবীদের গল্প পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে, তাদের মধ্যে একজন হলেন পশ্চিমবঙ্গের ৭২ বছর বয়সী মাতঙ্গিনী হাজরা। মহাত্মা গান্ধীর ডাকে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। স্বাধীনতার পতাকা হাতে ধরে রেখে বর্বর শ্বেতাঙ্গ বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণের মুখোমুখি হন এই মহান ৭২ বছরের বৃদ্ধা মহিলা। ব্রিটিশ বাহিনীর গুলিতে লুটিয়ে পড়েও জাতীয় পতাকা মাটিতে পড়তে দেননি তিনি । । এই কারণেই তাঁকে ‘গান্ধী বুড়ি’ বলা হয়। মাতঙ্গিনী হাজরা সারাজীবন যে যন্ত্রণা সহ্য করেছেন তা ভেবেই সকলে ভয়ে কেঁপে উঠবে।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ নগেন্দ্র সিনহা তার আগস্ট বিপ্লবের আত্মত্যাগ সম্পর্কে লেখা “আগস্ট বিপ্লবের শহীদ” বইতে বলেছেন, মাতঙ্গিনী হাজরা ১৮৭০ সালের ১৯ অক্টোবর তৎকালীন বাংলার মেদিনীপুর জেলার হোগলা গ্রামে একটি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দারিদ্র্যের কারণে তার বাবা তাকে ১২ বছর বয়সে ৬২ বছর বয়সী বিপত্নীক ত্রিলোচন হাজরার সঙ্গে বিবাহ দেন। সৎ সন্তানরা কখনও মাতঙ্গিনীকে মেনে নেয়নি। এদিকে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি কোনও সন্তান ছাড়াই বাল্যবিধবা হয়েছিলেন। যখন তার সৎ-সন্তানরা তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়, তখন সে তমলুকের নিকটবর্তী শহরে একটি কুঁড়েঘরে থাকতে শুরু করে এবং শ্রমিক হিসাবে কাজ করে জবীনযাপন করতে থাকেন। এভাবে একাকী জীবনযাপন করতে করতে তার জীবনের ৪৪টি বছর কেটে যায়। সেই সময়ে মহিলাদের ঘরের বাইরে বেরোতে দেওয়া হতো না, তখন তাদের জীবনও কুঁড়েঘরের মধ্যেই বন্দী ছিল। ৬২ বছর বয়স পর্যন্ত স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কে তাঁর কোনও ধারণা ছিল না। তিনি জানতেন না এইসব কি কারণে ঘটছে, তারপর তিনি তাঁর এলাকায় ব্রিটিশ শাসনের নৃশংসতা দেখেন এবং তাঁর আশেপাশের মানুষদের কাছ থেকে মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলন সম্পর্কে জানতে পারেন, তারপর তিনি তার বাকি জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পান।
দেশের প্রতি এই বৃদ্ধার ভালবাসা ও আত্মত্যাগ খুব ভালোভাবেই অনুমান করা যায়। ১৯৩২ সালে একদিন মাতঙ্গিনী হাজরার বাড়ির পাশ দিয়ে আইন অমান্য আন্দোলনের একটি মিছিল যায়। এই মিছিলে তাঁর কথামত শঙ্খধ্বনি দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানিয়ে মিছিল এগোতে শুরু করে। তমলুকের কৃষ্ণগঞ্জ বাজারে অনুষ্ঠিত এক সভায় মাতঙ্গিনীসহ সকলে স্বাধীনতা সংগ্রামে শরীর, মন, অর্থ দিয়ে দেশ সেবা করার শপথ নেন। লবণ আইন ভঙ্গ করে জেলও খেটেছেন মাতঙ্গিনী হাজরা। মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে অন্যান্য বিপ্লবীদের সঙ্গে তিনি লবণ তৈরি করে লবণ বিরোধী আইন ভঙ্গ করেন এবং গ্রেফতার হন। তাকে খালি পায়ে বহু কিলোমিটার হাঁটার শাস্তি দেওয়া হয়েছিল এবং বৃদ্ধ বয়সেও সে শাস্তি তিনি ভোগ করেন।
মাতঙ্গিনী হাজরার নিজের সংসার না থাকায় আশেপাশের যেকোনও মহিলার সাহায্যের প্রয়োজন হলে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়তেন। ১৯৩২ থেকে ৩৩ সালে এই অঞ্চলে গুটি বসন্ত এবং কলেরার মতো রোগ দেখা দেয়। নিঃসন্তান মাতঙ্গিনী শিশু ও মহিলাদের মা হয়ে সকলের সেবা করেছেন। তাকে দেখে ধীরে ধীরে অন্য মহিলারাও আইন অমান্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে যখন বাংলার তৎকালীন গভর্নর অ্যান্ডারসন কর নিষেধাজ্ঞা আন্দোলনকে দমিয়ে দিতে তমলুক আসেন, তখন তার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিবাদ হয়। প্রবীণ মাতঙ্গিনী হাজরা প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং কালো পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে এবং বৃদ্ধ বয়সে তাকে ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের পর মুর্শিদাবাদ জেলে বন্দী করে।
সেখানে তিনি অন্যান্য গান্ধীবাদীদের সংস্পর্শে আসেন এবং মুক্তি পাওয়ার পর একটি চরকা নিয়ে খাদি কাপড় তৈরি করতে শুরু করেন। তিনি নিজে খাদি পরতেন এবং অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করতেন। তাই মানুষ তাকে ‘গান্ধী বুড়ি’ নাম দিয়েছিল এবং এই নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন।
তমলুকে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন মাতঙ্গিনী হাজরা। মেদিনীপুর জেলায় যখন সমস্ত সরকারি অফিস ও থানায় ভারতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের প্রতীকী আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তখন তিনি সবচেয়ে প্রথমে ছিলেন।
১৯৪২ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর একটি বিশাল নিরস্ত্র মিছিল তমলুকের কোর্ট এবং পুলিশ লাইনগুলি দখল করতে চলেছিল। এর অগ্রভাগে ছিলেন মাতঙ্গিনী। প্রায় ছয় হাজার মুক্তিযোদ্ধার এই মিছিলে নেতৃত্ব দেন মাতঙ্গিনী, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন মহিলা স্বেচ্ছাসেবক।
মিছিলটি তমলুকের সামনে এগোতেই পুলিশ বন্দুক তাক করে মিছিলটি ঘিরে ফেলে। বিক্ষোভকারীদের থামানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে মিছিলে আতঙ্কের সৃষ্টি হয় এবং লোকজন ছত্রভঙ্গ হতে থাকে, কিন্তু তখনই পতাকা নেড়ে এগিয়ে আসেন ৭২ বছরের মাতঙ্গিনী। তাদের উচ্ছ্বাস দেখে মিছিলের উৎসাহ ছিল নজরকারা। ইংরেজ সেনাবাহিনীর সামনে মাতঙ্গিনী স্লোগান তুলেছিল, “আমি পতাকা উত্তোলন করব, আমাকে কেউ আটকাতে পারবে না।” এরপরে তিনি বন্দে মাতরম স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে যান। তমলুক থানার অদূরে বানপুকুর পাড়ে ব্রিটিশ বাহিনীর গুলিতে লুটিয়ে পড়েও জাতীয় পতাকা মাটিতে পড়তে দেননি তিনি।
তাঁর স্মরণে, তমলুক শহরে একটি বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে মাতঙ্গিনী হাজরার একটি বিশাল মূর্তি রয়েছে। পরে, কলকাতার বিখ্যাত ধর্মতলা এলাকায় মাতঙ্গিনী হাজরার একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়। মহানগরে প্রথম কোনো মহিলার মূর্তি স্থাপন করা হয়। দক্ষিণ কলকাতার একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে মাতঙ্গিনী হাজরা রোড এবং তার সম্মানে একটি মোড়ের নামকরণ করা হয়েছে মাতঙ্গিনী হাজরা মোড় (বর্তমানে সেটি হাজরা মোড় নামে পরিচিত) ।

