আগরতলা, ১৫ নভেম্বর (হি.স.) : থেমে গেলেন ফেলুদা। রয়ে গেল অপু। সেই প্রথম চলচ্চিত্রেই আপামর বাঙালির মনে রেখাপাত করতে পেরেছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত সৃষ্টি ‘অপুর সংসার’ থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। আজ জীবনযুদ্ধে হেরে গেলেন তিনি। রবিবাসরীয়ের দিন যে দুঃসংবাদ বয়ে এনেছে তা যে শুধু পশ্চিমবঙ্গকে নাড়িয়ে দিয়েছে তেমন নয়। ত্রিপুরাও আজ কিংবদন্তি অভিনেতার প্রয়াণে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মানিক দত্ত, বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী তিথি দেববর্মণ সহ তাঁর অগুণিত গুণমুগ্ধ শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছেন।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মানিক দত্তের কথায়, ত্রিপুরাকে আলাদাভাবে ভালোবাসতেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এই ছোট্ট পাহাড়ি রাজ্যের প্রতি তাঁর আলাদা দরদ ছিল। পাহাড়ি অঞ্চল বলেই হয়ত প্রকৃতির টান তাঁকে ভীষণ আকৃষ্ট করত। মানিকবাবু বলেন, খুবই উঁচু মানের অভিনেতা ছিলেন তিনি। তাই, ত্রিপুরার দর্শকদের খুবই ভালোবাসতেন। ত্রিপুরাবাসীর আন্তরিকতাই তাঁকে বারবার এ-রাজ্যে টেনে এনেছে। আসলে, ত্রিপুরার মানুষের নাট্য অনুভূতি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, স্মৃতির পাতা উল্টে গলগল করে বলে যান অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মানিক দত্ত।
তিনি বলেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে বহু পুরনো সম্পর্ক। তিনি আমাকে ভীষণ নির্ভর করতেন। তাই ২০০০ সালে বড়দোয়ালি স্কুলের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়ে বাড়ির অমতেই ছুটে এসেছিলেন। কারণ, ওই সময় ত্রিপুরায় উগ্রপন্থীদের প্রচণ্ড উৎপাত ছিল। সে-কারণে তাঁর ছেলেমেয়ে ত্রিপুরায় আসতে বারণ করেছিলেন তাঁকে। কিন্তু, তিনি আমার উপর ভরসা করে চলে আসেন, আবেগের সুরে বলেন মানিকবাবু। তাঁর কথায়, বিভিন্ন সময়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে টেলিফোন যোগাযোগ ছিল। প্রত্যেক বছর বিজয়া এবং নববর্ষে তাঁকে টেলিফোনে কুশল বিনিময় করেছি। তিনি বলেন, রূপম নাট্য গোষ্ঠীর উদ্যোগে ১৯৯৮ সালের ২৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত নাট্য-উৎসবে এসেছিলেন কিংবদন্তি ওই অভিনেতা। শ্রুতি নাটক ‘একটু সুখ’-এ তিনি অভিনয় করেছিলেন। এমনই বহু স্মৃতি আজ ভীষণ মনে পড়ছে। তাঁর প্রয়াণে শূন্য আসন আর কখনও পূর্ণ হওয়ার নয়। মানিকবাবু বাংলা চলচিত্র জগতের কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
একইভাবে শোক প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী তিথি দেববর্মণ। তাঁর কথায়, খুবই সহজ সরল মানুষ ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আজ তাঁকে জড়িয়ে অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে। তিনি বলেন, বড়দোয়ালি স্কুলের অনুষ্ঠানে প্রথম আমার গান শুনেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আমার গানের খুব প্রশংসা করেছিলেন তিনি। তার পর তাঁর সাথে বৃষ্টিভেজা ভালোবাসা অ্যালবামে একত্রে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। তিনি আবৃত্তি ও ভাষ্যপাঠ করেছিলেন। অতীতের স্মৃতি মনে করে তিথি দেববর্মণ বলেন, কলকাতায় দেশপ্রিয় পার্কে স্টুডিওতে প্রথম যেদিন তাঁকে দেখেছিলাম, মনে হয়নি তিনি এত বড় মাপের একজন মানুষ। আমাকে মেয়ের মতো ভালোবাসতেন তিনি। ওই অ্যালবামে সংলাপ খুবই কঠিন ভাষায় ছিল। অথচ, রেকর্ডিঙে তাঁকে যতই দেখেছি ততই অবাক হয়েছি। তিনি জানান, ২০০৭ সালের ৩০ এপ্রিল ওই অ্যালবাম প্রকাশ হয়েছিল। অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছিল তা।
তিথি দেববর্মণ এদিন আবেগের সুরে বলেন, আগরতলা টাউন হল-এ ওই বছর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে একত্রে অনুষ্ঠান করেছিলাম। সেই স্মৃতি মনে হলে আজও শরীর শিউরে উঠে। কারণ, দর্শকাসন পুরো ভরতি হয়ে গেলেও মানুষ দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান দেখেছেন। আজ তাঁর প্রয়াণে একজন প্রকৃত অভিভাবককে হারিয়েছি। তাঁর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করছি। সৌমিত্রবাবুর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি, বলেন তিথি দেববর্মণ।
প্রসঙ্গত, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অন্তিমবার ত্রিপুরায় ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা-র নাট্যোৎসবে এসেছিলেন।