গুয়াহাটি, ১১ ফেব্রুয়ারি (হি.স.) : দিল্লিতে সরকার গঠনের চিন্তাই করেনি বিজেপি, কেবলমাত্র দলীয় ভোটের হার বাড়ানোই লক্ষ্য ছিল, দাবি করে বলেছেন নর্থ-ইস্ট ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (নেডা)-এর আহ্বায়ক তথা অসমের বহু দফতরের মন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা। প্রায় একই কথা বলেছেন বিজেপির অসম প্রদেশ সভাপতি রঞ্জিতকুমার দাসও।
মঙ্গলবার দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর বিজেপি-র পরাজয় সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে হিন্দুস্থান সমাচার-এর পক্ষ থেকে নেডা-র আহ্বায়ক হিমন্তবিশ্ব শৰ্মার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। জিজ্ঞাসা শেষ হয়নি, ড. শর্মা বলেন, ‘দিল্লিতে সরকার গঠন করার কথা বিজেপি কখনও ভাবেনি। আসলে দিল্লির জনতা লোকসভায় বিজেপি এবং বিধানসভায় আপ-কে চান। আপ সরকার দিল্লির মানুষকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ এবং পানীয় জল সরবরাহ করেছে, এর সুফল পেয়েছেন তাঁরা। তবে কংগ্রেসকে সাফ করা গেছে, এটাই বড় কথা। তবে বিধানসভায় বিজেপির ভোটের হার বেড়েছে এটাই বড় কথা।’ অসমে দিল্লি নিৰ্বাচনের প্ৰভাব পড়বে কি না জানতে চাইলে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ পালটা ব্যাঙ্গোক্তি, ‘দিল্লির মানুষ এসে অসমে ভোট দেন তা জীবনে কখনও দেখিনি। তবে এ ধরনের প্রশ্নকর্তা-সাংবাদিকরা যখন নিৰ্বাচনে ভোটদান করবেন তখন তার প্ৰভাব পড়তে পারে।’
এদিকে দিল্লির নিৰ্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে বিজেপি-র অসম প্রদেশ সভাপতি রঞ্জিতকুমার দাস বলেন, ‘দিল্লির নিৰ্বাচনী প্ৰচারে আমিও অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমি আগেই বলেছি আমরা দিল্লিতে সরকার গঠন করতে পারব না। অবশ্য সরকার গঠন করতে না পারলেও গতবারের চেয়ে ভোটের হার বাড়বে, বেড়েছেও। তাছাড়া বিধায়কের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে সাত। অন্যদিকে আম আদমি পার্টি জয়ী হলেও ভোটের গড় হার কমেছে। আর কংগ্রেস তো নিশ্চিহ্নই হয়ে গেছে।’
রঞ্জিত দাস বলেন, ‘দিল্লিতে নিৰ্বাচনী প্ৰচারে গিয়ে জনতার মুখে শুনেছি, লোকসভায় তাঁরা মোদী এবং বিধানসভায় কেজরিওয়ালকে চান, কোনও রাখঢাক না রেখেই বলেছিলেন দিল্লির ভোটাররা।’
দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রশান্ত চক্রবর্তীর মন্তব্য চাওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, কেজরিওয়ালের বিপরীতে বিজেপি-র কোনও বড় মুখ ছিল না। লোকসভায় বিজেপি ভোট পেয়েছিল মূলত মোদীর মুখের দিকে তাকিয়ে। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ফেসভ্যালু’। দিল্লিতে কেজরিওয়ালের মুখটির ফেসভ্যালু-র বিপরীতে বিজেপি-র কোনও মুখেরই বড় ফেসভ্যালু ছিল না। দ্বিতীয়ত, কংগ্রেসের বেশির ভাগ ভোটই গেছে আম আদমির পকেটে। তৃতীয়ত, অন্য কোনও বিরোধীও ছিল না ময়দানে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে ভোট দুটো দলের মধ্যেই ভাগ হয়েছে। আম আদমি ও বিজেপি। কিন্তু বিষয়টি তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বিভাজনটি হয়েছে একদিকে বিজেপি, অন্যদিকে সমস্ত বিরোধী। অন্যান্য প্রদেশে বিরোধী ভোট ভাগ হয়। দিল্লিতে হয়নি।
ড. প্রশান্ত চক্রবর্তীর আরও ব্যাখ্যা, ‘নির্বাচনী ইস্যুর দিক থেকে বড় শহরের চরিত্র আর প্রদেশের চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। দিল্লি পুরোটাই আরবান, বা নগরজীবন। নগরজীবনে বাঁচা-বাড়ার সমস্যাগুলো মূলত মানুষের মূল লক্ষ্য হয়। রাজ্যভিত্তিতে। ওখানে জাতীয় ইস্যু প্রাধান্য পায় না। কেজরিয়ালের উত্থান মূলত সামাজিক সমস্যা থেকেই। তিনি দীর্ঘদিন পাড়া-মহল্লার ছোটখাটো সমস্যায় জড়িয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর সরকার সাধারণ মানুষের প্রাথমিক সমস্যাগুলোকে নির্বাচনী প্রচারের মূল অভিমুখ করেছে। এবং ভরতুকি দিয়ে দেদার ‘ফ্রি’-র টোপ তিনি দিয়েছেন। বিদ্যুৎ, জল, ওষুধ-স্বাস্থ্য ইত্যাদিতে গুরুত্ব দিয়েছেন। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয় দিক। এগুলোর প্রভাব পড়েছে।
‘বিজেপি এই নির্বাচনে অনেকটা নিজেদের সর্বভারতীয় বিচারধারা বা তত্ত্বতেই আবদ্ধ ছিল। অনেকটা কমিউনিস্টদের মতো তাত্ত্বিক। কমিউনিস্টদের যেমন মার্কসবাদ, বিজেপির তেমনই রাষ্ট্রবাদ। তত্ত্ব বা বিচারধারা। কিন্তু নগরজীবনে সমস্যায় জেরবার মানুষ রাজ্যস্তরে রাষ্ট্রবাদকে ততটা গুরুত্ব দেয়নি। অথচ লোকসভায় দেয়। এর প্রমাণ গেল লোকসভা নির্বাচনে দিল্লিতে কেজরিয়ালের সরকার থাকার পরও দিল্লির সাতটি লোকসভা কেন্দ্রে ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজেপি জিতেছিল। সেটা তো বেশি দিনের কথা নয়। তিনি বলেন, আমরা সব সময়ই ভুলে যাই, প্রতিটি নির্বাচনের চরিত্র আলাদা। লোকসভা ও বিধানসভা সম্পূর্ণ আলাদা।
বলেন, ‘এ-ছাড়াও সবচেয়ে বড় কারণ মোল্লাতন্ত্রের রাষ্ট্রবিরোধী শক্তির এককাট্টা হওয়া। সিএএ এবং এনআরসি-র বিরুদ্ধে দেদার ফান্ডিং যে আরব দুনিয়ার লবি ও মাওবাদীদের লবি থেকে এসেছে, সেটা ইতিমধ্যে এনআইএ-র তদন্তেই প্রকাশ্যে এসেছে। সে অসমেই হোক বা দিল্লিতেই। বিরাট জাল ফেলা হয়েছিল। জেএনইউ হোক বা জামিয়া মিলিয়া বা শাহিনবাগ। এটা সকলেই লক্ষ করছেন, এই দেশের বিরাট সংখ্যক মুসলিম জনগণ এখনও ওই শরিয়তি ও আরবীয় সংস্কৃতিকেই শেষকথা বলে গণ্য করেন। এদের ভোট চিরদিন এককাট্টা হয়। শাহিনবাগ বা জামিয়ামিলিয়ার এই লবিটি দিল্লিতে একটা অস্থিরতা কায়েম রেখেছে। এবং বিজেপি মুসলমান-বিরোধী, এই প্রচারে সফলও হয়েছে। এদের সাথে মিলেছে জেএনইউ-এর বিষাক্ত ‘লালবাঁদরের দল’।’
চক্রবর্তী বলেন, ‘লক্ষ করবেন, আম আদমির জয়ে এরা উল্লসিত। কলকাতায় সিপিএম-এর সুজন চক্রবর্তী লাফাচ্ছেন। ভাবটা এমন যে জিতটা যেন এরাই জিতেছে। অথচ কেজরিওয়াল পুরো ধর্মীয় লোক। কমিউনিস্ট আদর্শের পুরো বিপরীত। তাও সিপিএম-এর এতো আনন্দ কেন? ওই যে, জেএনইউ, জামিয়ামিলিয়ার, শাহিনবাগের মুসলিম মৌলবাদী ষড়যন্ত্রটির সহায়ক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। অথচ সংসদীয় রাজনীতিতে লালঝান্ডুদের এমন অবস্থা যে এদের অস্তিত্ব খুঁজতে হলে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন।’
প্রশান্তবাবুও বলেন, ‘সবচেয়ে মজার কথা, এই নির্বাচনে কংগ্রেস নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কিন্তু এদের দিল্লির কর্মকতাদের বডি ল্যাংগুয়েজে মোটেও পরাজয়ের নিরাশাচিহ্ন নেই। এরা খুশি। অনেকেই মনে করছেন, রাহুল সোনিয়া গ্যাং চেয়েছিল এটাই। তাই মোটেও জোর দেয়নি। বরং নিজেদের ভোট দিয়েই তলায় তলায় আম আদমিকে সাহায্য করেছে। এদের সান্ত্বনা, অন্তত মোদি বিরোধী শক্তি জিতেছে।’

