কংগ্রেস ধরাশায়ি, বঙ্গের মডেল নস্যাৎ, বিজেপির উত্থান, উপনির্বাচনে জিতেও চিন্তা বাড়ল বামেদের

result-bye-electionনিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ২২ নভেম্বর৷৷ গুরুত্বহীন উপনির্বাচনে দুটি আসনেই বামেরা জয়ী হয়েছে৷ লাল দূর্গ খোয়াই নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারলেও, বড়জলা মেলারমাঠকে দুশ্চিন্তায় রেখেছে৷ খোয়াই বিধানসভা কেন্দ্রে সিপিএম প্রার্থী ২৪,৮১০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন৷ ২০১৩ বিধানসভা নির্বাচনে ঐ কেন্দ্রে প্রয়াত সিপিএম বিধায়ক সমীর দেব সরকার ২২,৬৯২ ভোট পেয়েছিলেন৷ স্বাভাবিক ভাবেই বলা যায় খোয়াই কেন্দ্রে সাফল্য বেড়েছে বামেদের৷ কিন্তু, বড়জলা আসনে উপনির্বাচনে সিপিএম প্রার্থী পেয়েছেন ১৫,৭৬৯ ভোট৷ যা ২০১৩ বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় ১৪১০ ভোট কম৷ আবার বিরোধী ভোটের সংখ্যা সিপিএমের প্রাপ্ত ভোট থেকে অনেক বেশী৷ ঐ কেন্দ্রে বিজেপি ১২,৩৯৫, তৃণমূল কংগ্রেস ৫,৬৯২ এবং কংগ্রেস ১,০৬৩ ভোট পেয়েছে৷ সব মিলিয়ে বিরোধী ভোটের মোট সংখ্যা ১৯,১৫০৷ ফলে, বড়জলা কেন্দ্র নিয়ে আত্মসন্তুষ্টিতে ভোগার কোন অবকাশ নেই সেটা বামেরা অস্বীকার করছেন না৷ মঙ্গলবার ফলাফল ঘোষণার পর সাংবাদিক সম্মেলনে সিপিএম রাজ্য সম্পাদক বিজন ধর অকপটে স্বীকার করেন, বড়জলা কেন্দ্রে ভোটারদের একটা অংশ অসন্তুষ্ট৷ তাঁদের তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি বিভ্রান্ত করতে পেরেছে বলে তিনি দাবি করেন৷ পাশাপাশি বলেন, বিজেপির বিরুদ্ধে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে৷ তবে, বিরোধী ভোট বেশী হওয়া সত্বেও বড়জলা কেন্দ্রটি ছিনিয়ে আনা ইতিবাচক বলেই মনে করছেন বিজনবাবু৷
অবশ্য দুটি আসনে উপনির্বাচনে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের৷ পশ্চিমবঙ্গকে মডেল হিসেবে তুলে ধরে মমতার নাম ভাঙিয়ে এরাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচনের মাধ্যমে বিধানসভায় প্রতিনিধি পাঠানোর ঐকান্তিক ইচ্ছা ভেস্তে গিয়েছে৷ বর্তমানে রাজ্য বিধানসভায় যারা তৃণমূলের বিধায়ক রয়েছেন তারা কেউই দলীয় ব্যানারে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিনিধিত্ব করছেন না৷ উপনির্বাচন সেখানে স্বাভাবিক ভাবেই তৃণমূলের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অগ্ণিপরীক্ষা ছিল৷ ভোটে লড়ে আসন টিকিয়ে রাখা আগামী দিনে তৃণমূলের সম্ভব হবে কি না তার ইঙ্গিত বড়জলা এবং খোয়াই বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে মিলেছে৷ দুটি আসনে উপনির্বাচনে খোয়াইতে কোন রকমে দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে তৃণমূল৷ কিন্তু, বড়জলাতে তৃতীয় স্থানে ঠাঁই হয়েছে দলটির৷ তাতে স্পষ্ট হয়েছে কংগ্রেস ভেঙ্গে তৃণমূল হলেও বামবিরোধী ভোটাররা সকলে তাঁদের উপর ভরসা করতে পারেননি৷ পশ্চিমবঙ্গের মডেল তুলে ধরে নির্বাচনী প্রচারে দলীয় শীর্ষস্তরের নেতারা বামবিরোধী ডাক দিলেও ভোটারদের মন জয় করতে তাঁরা অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছেন৷ ফলে, আগামী দিনে সুদীপ বর্মনদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় ইতিমধ্যেই জন্মেছে৷
এই উপনির্বাচনের ফলাফলে আগামীদিনে রাজ্য রাজনীতিতে সামান্য হলেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে৷ বিজেপি ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে৷ বিধানসভায় খাতা খুলতে না পারলেও বড়জলাতে বিজেপি কড়া টক্কর দিয়েছে বামেদের৷ সিপিএম প্রার্থীর সাথে বিজেপি প্রার্থীর ভোটে ফারাক ৩,৩৭৪৷ অবশ্য অমরপুর উপনির্বাচন থেকেই বিজেপির উত্থান লক্ষ্য করা গিয়েছে৷ বিজেপি রাজ্য সভাপতি বিপ্লব দেব খোয়াই কেন্দ্রটি নিয়ে নিজেও ধন্দে ছিলেন৷ কিন্তু, বড়জলা আসনে সাফল্য মিলবে সেই বিষয়ে অনেকটাই নিশ্চিত ছিলেন তিনি৷ জয় সম্ভব না হলেও বামবিরোধী হিসেবে বিজেপি সিপিএমকে আরও চিন্তায় ফেলে দিয়েছে৷ নোট বাতিলের প্রভাব উপনির্বাচনে পড়তে পারে সেই আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল৷ কিন্তু, বড়জলা আসনের ভোটাররা নোট বাতিলের জের মোটেও অসন্তুষ্ট নন, কিছুটা হলেও তা ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে৷ আর দেশের প্রাচীন দল কংগ্রেস শাসক দল এবং অন্য বিরোধী দলগুলির শক্তি বৃদ্ধিতে সাইনবোর্ড সর্বস্বতেই পরিণত হয়েছে দুটি আসনে উপনির্বাচনে৷ এই উপনির্বাচনে কংগ্রেসের জামানত জব্দ হয়েছে৷ বড়জলা কেন্দ্রে ১,০৬৩ ভোট এবং খোয়াই কেন্দ্রে মাত্র ৬৯৬ ভোট পেয়ে কংগ্রেস রীতিমতো দিশেহারা৷ সাংগঠনিক দিক দিয়ে খুবই দুর্বল আমরা বাঙালীর খোয়াই কেন্দ্রে কংগ্রেসের সাথে ভোটের ফারাক মাত্র ৩৭০৷ ফলে, ভোট গ্রহণ শেষে পিসিসি সভাপতির অকপট দাবি যে দুটি আসনেই সিপিএম জয়ী হবে এবং কংগ্রেস দ্বিতীয় স্থানে থাকবে তা আংশিক পূরণ হয়েছে৷
স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বহীন এই উপনির্বাচন আগামী ২০১৮ বিধানসভা নির্বাচনের লক্ষ্যে দিশা নির্দেশকের ভূমিকায় ছিল৷ সেখানে ফলাফলের নিরিখে বামেদের চিন্তা বাড়ল বলেই মত রাজনৈতিক মহলের৷
৪-বড়জলা (এসসি) বিধানসভা নির্বাচনী ক্ষেত্রে বামফ্রন্টের সিপিআই(এম) প্রার্থী ঝুমু সরকার ৩,৩৭৪ ভোটের ব্যবধানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থী শিষ্টমোহন দাসকে পরাজিত করেছেন৷ সিপিআই(এম) প্রার্থী ঝুমু সরকার পেয়েছেন ১৫,৭৬৯ ভোট৷ বিজেপি প্রার্থী শিষ্ট মোহন দাস পেয়েছেন ১২,৩৯৫ ভোট৷ এদিকে, এই কেন্দ্রে নোটাতে ভোট পড়েছে ৩৭৬৷
২৫-খোয়াই বিধানসভা নির্বাচনী ক্ষেত্রে বামফ্রন্টের সিপিআই(এম) প্রার্থী বিশ্বজিৎ দত্ত ১৬,০৯৪ ভোটের ব্যবধানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সারা ভারত তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী মনোজ দাসকে পরাজিত করেছেন৷ সিপিআই(এম) প্রার্থী বিশ্বজিৎ দত্ত পেয়েছেন ২৪,৮১০ ভোট৷ সারা ভারত তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী মনোজ দাস পেয়েছেন ৮৭১৬ ভোট৷ এদিকে, এই কেন্দ্রে নোটাতে ভোট পড়েছে ২৪৭৷ উল্লেখ্য, আজ সকাল ৮টা থেকে উমাকান্ত একাডেমির ভোট গণনা কেন্দ্রে ৪-বড়জলা (এসসি) বিধানসভা নির্বাচনী ক্ষেত্রের উপনির্বাচনের এবং খোয়াই মহকুমা শাসকের অফিসের গণনা কেন্দ্রে ২৫-খোয়াই বিধানসভা নির্বাচনী ক্ষেত্রের উপনির্বাচনের ভোট গণনা করা হয়৷
এদিন, খোয়াই ও বড়জলা কেন্দ্রে উপনির্বাচনে ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পর সাংবাদিক সম্মেলনে সিপিএম রাজ্য সম্পাদক বিজন ধর বলেন, বিরোধীদের কুৎসা এবং নৈরাজ্য সৃষ্টির যাবতীয় অপপ্রয়াস ব্যর্থ করে রাজ্যের দুটি বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে জনগণ বামফ্রন্টের উপরই আস্থা রেখেছেন৷ এটা মানুষের ইতিবাচক মনোভাবেরই প্রতিফলন৷ এই জয় বামফ্রন্টের একার জয় নয়, গণতন্ত্র প্রিয় মানুষের জয়, গণতন্ত্রের জয়৷
তবে, উপনির্বাচনে সিপিআইএম প্রার্থী কেন কিছুটা ভোট কম পেয়েছে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ হবে বলে জানান বিজনবাবু৷ কিছু মানুষ যে বিমুখ হয়েছেন তাও তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে৷ তিনি বলেন, বড়জলা বিধানসভা কেন্দ্রটি বিরোধীদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনার ঘটনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা৷ প্রদত্ত ভোট বিশ্লেষণ করে সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক বলেন, খোয়াই কেন্দ্রে সিপিআইএম ৬৬৫৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে৷ তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ২৩০৫ শতাংশ ভোট৷ বিজেপি পেয়েছে ৬০৮ শতাংশ ভোট৷ কংগ্রেস পেয়েছে ১০৮ শতাংশ ভোট৷ অপরদিকে বড়জলা কেন্দ্রে সিপিআইএম পেয়েছে ৪৪৮৪ শতাংশ ভোট৷ বিজেপি পেয়েছে ৩৫২৪ শতাংশ ভোট৷ তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ১৬১৮ শতাংশ ভোট৷ কংগ্রেস পেয়েছে ৩০৬ শতাংশ ভোট৷ আমরা বাঙালী পেয়েছে ১ শতাংশ ভোট৷
এদিকে, ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিজেপির প্রদেশ সভাপতি বিপ্লব কুমার দেব এবং রাজ্য প্রভারী সুনীল দেওধর স্পষ্টতই বলেছেন জনগণ বিজেপিকে চাইছেন৷ উপনির্বাচনে জয় নিশ্চিত না হলেও এর কারণ সম্পর্কে রাজ্যবাসীর কিছুই অজানা নেই৷ উপনির্বাচনে রাজ্যের জনগণ বিজেপিকে যে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন এর প্রভাব ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে স্পষ্টভাবে মিলবে বলে নেতৃবৃন্দ অভিমত ব্যক্ত করেছেন৷ ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিজেপিকে বিপুল ভোটে জয়ী করারই ইঙ্গিত মিলেছে উপনির্বাচনের ফলাফলে৷ যে কোন মূল্যে ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি যে ক্ষমতাসীন হতে চায় তারও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন নেতৃবৃন্দ৷ রাজ্যের সর্বত্রই বিজেপি সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করছে বলে জানান তারা৷ সাংগঠনিক শক্তির উপর ভিত্তি করেই দলকে ক্ষমতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে৷ কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার যে সব জনমুখী কর্মসূচী রূপায়িত করে চলেছে তা এই রাজ্যের জনগণও সুনজরেই দেখছেন৷ কাজের নিরিখেই জনগণ কোন রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতার আসনে আসীন করেন বলে তারা উল্লেখ করেন৷ বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে বিজেপি বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করবে বলে জানান নেতৃবৃন্দ৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *