কংগ্রেস ও তৃণমূল কাছাকাছি

কথায় আছে রাজনীতিতে শেষ কথা বলিয়া কিছু নাই৷ বিজেপি বা মোদিকে রুখিতে তৃণমূল কংগ্রেস কংগ্রেসের সঙ্গেও হাত মিলাইতে প্রস্তুত৷ তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বার্তা দিয়াছেন৷ দিল্লীতে প্রাক্তন সেনা কর্মীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘিরিয়া কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সহ সভাপতি রাহুল গান্ধীকে গ্রেপ্তারের পরই মমতা তাঁহার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিয়াছেন এবং রাহুলের পাশে থাকিবার বার্তা দিয়াছেন৷ এনডিটিভি’র সম্প্রচারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারীর নিন্দা করিয়া মমতা কংগ্রেসকে নিয়া জোট গঠনের অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করিয়াছেন৷ শনিবার আগরতলায় সাংবাদিক সম্মেলন করিয়া মমতার সেনাপতি মুকুল রায় স্পষ্ট করিয়া দিয়াছেন বিজেপিকে রুখিতে বিরোধী জোটে কংগ্রেস থাকিলে আপত্তি নাই৷ সোজা কথায়, তৃণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেস আবার এক মঞ্চে আসীন হইবার মতো সম্ভাবনা প্রবল হইয়াছে৷ তৃণমূল সাংসদ তথা যুব তৃণমূলের সর্বভারতীয় সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দূর্ঘটনার পরই মমতাকে ফোন করেন রাহুল গান্ধী৷ মমতার কথা হয় সোনিয়া গান্ধীর সচিবের সঙ্গেও৷ সেই সময়ই বরফ গলার শুরু৷ রাজনীতির স্বার্থে তৃণমূল ও কংগ্রেসকে এক জোট হইবার তাগিদ বাড়াইয়াছে৷ জাতীয় রাজনীতিতে পা রাখিতে এবং মাটি শক্ত করিতে হইলে জোট রাজনীতি ছাড়া যে অসম্ভব মমতা তাহা হাড়ে হাড়ে বুঝিয়াছেন৷ বাম প্রভাবিত পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ছাড়া অন্য রাজ্যগুলিতে তৃণমূলের দাঁড়াইবার মাটি নাই৷ বছরেরও বেশী আগে দিল্লীতে সমাবেশ ডাকিয়া ফাঁকা মাঠে বত্তৃণতা করিতে হইয়াছে মমতাকে৷ ফাঁকা মাঠ দেখিয়া বিশিষ্ট সমাজসেবি আন্না হাজারেও কথা দিয়া সভাস্থলে উপস্থিত হন নাই৷ মমতা বুঝিয়া গিয়াছেন জাতীয় স্তরে তৃণমূলকে আগাইতে হইলে অন্যান্য দলের সঙ্গে জোট বদ্ধ হইতে হইবে৷ কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীও বুঝিয়াছেন মমতা ছাড়া আর উপায় নাই৷ শক্তিশালী বিরোধী মঞ্চ গড়িয়া তুলিতে না পারিলে সামনের ভয়ঙ্কর দিনের মোকাবিলা করা কঠিন হইবে৷
পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের সঙ্গে নির্বাচনী আঁতাত যে ভুল হইয়াছে তাহা কংগ্রেস নেতৃত্ব বুঝিতে পারিয়াছেন৷ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তাহা মানিয়া নেয় নাই৷ আর এই জন্যই কংগ্রেসের ভোট সিপিএম পায় নাই৷ পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস ও সিপিএমের মধ্যে সংঘাত তো দীর্ঘদিনের৷ সিপিএমের হাতে বহু কংগ্রেস কর্মী সমর্থক খুন হইয়াছেন৷ অন্যদিকে কংগ্রেসের বিরুদ্ধেও সিপিএমের খুনের বহু অভিযোগ আছে৷ এই রক্তে রাঙানো হাত দিয়া হাত মিলানোর জবাব তো পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ভালো ভাবেই দিয়াছেন৷ এই শিক্ষা আগামী দিনে রাজনীতির পথ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সহায়ক হইতে পারে৷ মমতা তো কংগ্রেস ঘরানা হইতেই উঠিয়া আসিয়াছেন৷ ফলে, কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধিতে তাহার তেমন অসুবিধা হইবার কথা নহে৷ রাজনীতিতে সোজা হইয়া দাঁড়াইতে হইলে রাজনীতির শক্তিশালী মঞ্চ তৈরীর উপর জোর দিতে হইবে৷ মমতা এবং সোনিয়া বা রাহুল তাহা অন্তত ভাল করিয়া বুঝিতে পারিয়াছেন৷ আর এই জন্যই, রাজনীতির প্রয়োজনে মমতা সোনিয়ার নৈকট্য বাড়িলে আশ্চর্য্যের হইবে না৷ একথা ঠিক, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করিয়াছে৷ এক সময়ের প্রবল প্রতাপান্বিত সিপিএম একবারেই দূর্বল অস্তিত্ব নিয়া আছে৷ মাথা তুলিবার, এমনকি সামান্য ফোঁস করিবারও যেন শক্তি নাই৷ এই অবস্থায় জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ করিয়া কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি ও নিজেদের শক্তিকে নিশ্চিত করিতে অবিজেপি জোট গঠনের তাগিদ আসিয়াছে৷ কংগ্রেস এখন কার্য্যত বন্ধুহীন৷ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের মনে যে ক্ষোভ অসন্তোষ দিনে দিনেই দানা বাঁধিতেছে তাহাকে কাজে লাগাইয়া উঠিয়া দাঁড়াইবার সুযোগ আসিয়াছে৷ ক্ষমতার দম্ভেই রাজনীতিক বা শাসকরা ভুল পথে পা বাড়াাইয়া থাকেন৷ মোদি সরকারও বিরোধীদের সামনে ‘ইস্যু’ তুলিয়া দিতেছেন৷ এবং বুঝাইয়া দেওয়া হইতেছে ক্ষমতার আগুন কত ভয়ংকর৷ মমতা সেই আগুনের আঁচ পাইয়াছেন৷ মমতা কেন তাবড় রাজনৈতিক দল, সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করিয়াছেন ‘আচ্ছে দিন’ কিভাবে আসিতেছে৷
মাত্র আড়াই বছরের শাসনের মধ্যেই কেন্দ্রের শাসকরা এমন অসহিষ্ণু হইয়া পড়িতেছেন৷ দেশের প্রগতি, সাধারণ মানুষের জন্য বিবিধ কর্মসূচী ইত্যাদি প্রকল্প গ্রহণ ও রূপায়নের নিশ্চয়ই প্রয়াস চলিতেছে৷ একথাও ঠিক রাতারাতি খোলনলচে বদল করাও অসম্ভব৷ এই পরিস্থিতিতে দেশবাসীর মন জয় করিবারই তো কথা৷ কিন্তু, জনমনে বিদ্রোহের আঁচ মিলিতেছে কেন? ঘুমন্ত কংগ্রেস জাগিয়া উঠিতেছে কিভাবে? একই দিনে বারবার রাহুলকে গ্রেপ্তার করিয়া বীরত্বের ‘শিরোপা’ দেওয়া হইতেছে কোন্ লক্ষ্যে৷ মানুষের সহানুভুতি যাইবে রাহুলের দিকেই৷ এই ভাবে শাসক দলের একের পর এক ভুল পদক্ষেপ বিরোধী দলকে সুবিধা আনিয়া দেয়৷ রাজনীতির মঞ্চে আবার বীরের মর্যাদায় ভূষিত হইতে চলিয়াছেন রাহুল৷ কথায় আছে, যে যায় লংকায় সেই হয় রাবণ৷ তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি মিডিয়ার বিরুদ্ধে সুর চড়াইয়া কথা বলেন না? এই ত্রিপুরায় সিপিএম শাসকরা তো প্রতিনিয়ত মিডিয়ার মুন্ডুপাত করেন৷ এইসব ঘটনাই রাজনীতির সুবিধাবাদের জন্ম দেয়৷ আমরা বিশ্বাস করি, গণতন্ত্র ও প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতার উপর আঘাত হানিয়া শাসক শক্তিকে রাজনৈতিক ক্ষতির মুখেই পড়িতে হয়৷ ইহাই ইতিহাসের শিক্ষা৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *